চায়ের তিন নিলাম কেন্দ্র

দেশে নিলামে বিক্রি হওয়া চায়ের মাত্র ৩% লেনদেন হয় শ্রীমঙ্গল ও পঞ্চগড়ে

দুইশ বছরের বেশি সময় ধরে বাংলায় চায়ের আবাদ হয়। দেশভাগের পর ১৯৪৮ সালে চট্টগ্রামে প্রথম আন্তর্জাতিক চা নিলাম কেন্দ্র স্থাপন করা হয়।

এক দশক ধরে চায়ের সবচেয়ে বেশি উৎপাদন এলাকা সিলেটে ২০১৮ সালে নিলাম কেন্দ্র চালু করা হয়। তবে কেন্দ্রটি ক্রেতা-বিক্রেতাদের আকর্ষণ করতে পারেনি। দুই বছর আগে পঞ্চগড়ে দেশের তৃতীয় চা নিলাম কেন্দ্র স্থাপন করা হয়। অনলাইননির্ভর এ কেন্দ্রের লেনদেনও আশাব্যঞ্জক নয়। এতে নিলাম বাজার সম্প্রসারণের মাধ্যমে উৎপাদকদের চা বিক্রিতে দীর্ঘসূত্রতা এড়ানোর কৌশল ভেস্তে যেতে বসেছে।

বাংলাদেশ চা বোর্ড সূত্র বলছে, দেশে নিলামে বিক্রি হওয়া চায়ের প্রায় ৯৭ শতাংশ লেনদেনই হয় চট্টগ্রামের নিলাম কেন্দ্রে। বাকি প্রায় ৩ শতাংশ বিক্রি হয় শ্রীমঙ্গল ও পঞ্চগড়ে। চা উৎপাদনের সিংহভাগ বাগান ও কারখানা থাকলেও ব্যবসায়ীদের আনাগোনা কম থাকা এবং নিলামের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত উন্নয়নের অভাবে নতুন দুটি নিলাম কেন্দ্র কার্যত অচল হয়ে পড়ছে। বড় ক্রেতাপ্রতিষ্ঠানের অভাবে স্থানীয় ছোট ক্রেতাদের ওপর নির্ভর করে কোনো রকমে নিলাম কেন্দ্র চালিয়ে যাচ্ছেন উদ্যোক্তারা।

তথ্যমতে, ২০২৪-২৫ মৌসুমে দেশের তিনটি নিলাম কেন্দ্রে বিক্রি হয়েছে ৮ কোটি ৭৭ লাখ ৩০ হাজার কেজি চা। এর মধ্যে শ্রীমঙ্গল ও পঞ্চগড়ে মোট বিক্রি হয়েছে ২ দশমিক ৮৫ শতাংশ বা ২৪ লাখ ৩০ হাজার কেজি। বাকি ৮ কোটি ৫৩ লাখ কেজি চা এককভাবে বিক্রি হয়েছে চট্টগ্রাম নিলাম কেন্দ্রে। অন্যদিকে সর্বশেষ নিলামবর্ষে (২০২৫-২৬) ৯ কোটি ৬ লাখ ৬০ হাজার কেজি চা বিক্রি হয়, এর মধ্যে মাত্র ২৯ লাখ ৪০ হাজার বা ৩ দশমিক ৩৫ শতাংশ চা বিক্রি হয়েছে শ্রীমঙ্গল ও পঞ্চগড় নিলামে। বাকি ৮ কোটি ৭৭ লাখ ২০ হাজার কেজি চা এককভাবে বিক্রি হয়েছে চট্টগ্রাম নিলাম কেন্দ্রে।

এদিকে ২০২৬-২৭ মৌসুমের নিলামবর্ষেও চট্টগ্রাম ব্যতীত অন্য দুটি নিলামে চা বিপণনে নিম্নমুখী ধারা অব্যাহত রয়েছে। তিনটি নিলাম কেন্দ্রের সর্বশেষ পাঁচটি করে নিলাম পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ১-২৯ জুন পর্যন্ত চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত পাঁচটি নিলামে ১ কোটি ১৬ লাখ ৭ হাজার কেজি চা গড়ে ২৬৯ টাকা ১৪ পয়সায় বিক্রি হয়েছে। ২০ মে থেকে ২৪ জুন পর্যন্ত শ্রীমঙ্গলের সর্বশেষ পাঁচটি নিলামে মাত্র ১ লাখ ৮৯ হাজার কেজি চা গড়ে ২৫২ টাকা ৫ পয়সায় লেনদেন হয়েছে। এছাড়া ২৮ এপ্রিল থেকে ১৬ জুন পর্যন্ত পঞ্চগড়ে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ পাঁচটি নিলামে ১ লাখ ৩৭ হাজার কেজি চা গড়ে ২৩৭ টাকা ৫৯ পয়সায় বিক্রি হয়েছে।

চা-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চায়ের উৎপাদন এলাকা হলেও এখনো ক্রেতাদের আকৃষ্ট করার মতো অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়নি শ্রীমঙ্গল ও পঞ্চগড়ে। চায়ের মতো কৃষিজ পণ্য যথাযথ সংরক্ষণে ওয়্যারহাউজ নির্মাণ এবং অর্থ লেনদেনের সংকটের কারণে ক্রেতারা এখনো নতুন দুটি নিলাম কেন্দ্রে যেতে অনাগ্রহী। দেশের সিংহভাগ বৃহৎ ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয় ও চা কেনার সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ঢাকা ও চট্টগ্রামে অবস্থান করেন। শ্রীমঙ্গলের মতো এলাকায় গিয়ে চা কেনার ক্ষেত্রে বৃহৎ ক্রেতাপ্রতিষ্ঠানগুলো এখনো সুবিধাজনক মনে করছে না।

চা বোর্ডের তথ্য বলছে, ২৯ জুন পর্যন্ত চট্টগ্রাম কেন্দ্রে নয়টি নিলাম অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব নিলামে মোট চা বিক্রি হয়েছে ১ কোটি ৭৬ লাখ ৮৬ হাজার ৩২৮ কেজি, যার গড় বিক্রয়মূল্য কেজিপ্রতি ২৭২ টাকা ১০ পয়সা। এ পর্যন্ত শ্রীমঙ্গলে নিলাম হয়েছে আটটি। এতে ২ লাখ ৮৮ হাজার ৬৪৫ কেজি চা, প্রতি কেজি গড়ে ২৫৩ টাকা ৯১ পয়সায় বিক্রি হয়েছে। একই সময়ে পঞ্চগড়ে অনুষ্ঠিত পাঁচটি নিলামে মোট চা বিক্রি হয়েছে ১ লাখ ৩৭ হাজার ১৩৫ কেজি। এসব চায়ের কেজিপ্রতি গড় মূল্য ছিল ২৩৪ টাকা ৯৩ পয়সা।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চট্টগ্রাম নিলামে চায়ের দাম সবচেয়ে বেশি। শ্রীমঙ্গলে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ এবং পঞ্চগড়ে সবচেয়ে কম দামে চা বিক্রি হয়েছে। যার কারণে চা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বাকি দুটির তুলনায় চট্টগ্রামে চা পাঠানোর প্রবণতা বেশি। দেশের প্রায় ৬৭ শতাংশ চা-ই সিলেট অঞ্চলে উৎপাদন হলেও আট বছর ধরে চালু হওয়া শ্রীমঙ্গলের নিলাম কেন্দ্র এখনো কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারেনি।

বাংলাদেশ চা বোর্ডের সদস্য (গবেষণা ও উন্নয়ন) মোহাম্মদ মোয়াজ্জম হোসাইন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘স্থানীয় মানুষ ও উৎপাদনকারীদের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার শ্রীমঙ্গল ও পঞ্চগড়ে নিলাম কেন্দ্র চালু করেছে। কিন্তু এসব কেন্দ্র সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা ও ক্রেতা-বিক্রেতাদের নিয়ে আসার দায়িত্ব বেসরকারি উদ্যোক্তাদের। ধারাবাহিকভাবে অবকাঠামো নির্মাণসহ চাহিদা অনুযায়ী মানসম্মত চা প্রতিযোগিতামূলক দামে সরবরাহের নিশ্চয়তা দেয়া গেলে ধীরে হলেও নতুন নিলাম বাজারগুলো জনপ্রিয় হবে।’ তবে এখন পর্যন্ত নতুন দুই নিলাম কেন্দ্রের চা উত্তোলন ও বিক্রির পরিমাণ ২-৩ শতাংশের বেশি না ওঠার বিষয়টি হতাশাজনক বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

জানা যায়, ২০২৫ সালে দেশে ৯ কোটি ৪৯ লাখ ৩০ হাজার কেজি চা উৎপাদন হয়। সবচেয়ে বেশি ৪ কোটি ৪৮ লাখ ৫০ হাজার কেজি বা মোট উৎপাদিত চায়ের ৪৭ শতাংশ উৎপাদন হয় মৌলভীবাজারে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২১ শতাংশ হয় পঞ্চগড়ে। এছাড়া হবিগঞ্জে ১৬ শতাংশ, চট্টগ্রামে ১১ ও সিলেট জেলায় ৪ শতাংশ চা উৎপাদন হয়। দেড় দশক আগে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে চায়ের নিলাম কেন্দ্র সরিয়ে নিতে স্থানীয়ভাবে আন্দোলন শুরু করেন ব্যবসায়ী ও বাগান মালিকরা। দাবির মুখে ২০১৮ সালের ১৪ মে শ্রীমঙ্গলে দেশের দ্বিতীয় নিলাম কেন্দ্র চালু করা হয়। এরপর ২০২৩ সালের ৪ অক্টোবর থেকে পঞ্চগড়ে দেশের তৃতীয় ও প্রথম অনলাইন নিলাম কেন্দ্র চালু করে সরকার।

শ্রীমঙ্গলে টি প্ল্যান্টার্স অ্যান্ড ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ এবং পঞ্চগড়ে বাংলাদেশ স্মল টি গার্ডেন ওনার্স অ্যান্ড টি ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশন চা নিলাম বাজার পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত। অন্যদিকে আট দশকের পুরনো টি ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ চট্টগ্রামে চায়ের নিলাম বাজার পরিচালনা করে।

বাংলাদেশ চা বোর্ডের টি সেলস কো-অর্ডিনেশন কমিটির সঙ্গে সমন্বয় করে চলতি মৌসুমে (এপ্রিল-মার্চ) চট্টগ্রামে ৪৭টি, শ্রীমঙ্গলে ৪৭টি এবং পঞ্চগড়ে ২৫টি নিলাম অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম নিলাম অনুষ্ঠিত হয় প্রতি সপ্তাহের সোমবার, শ্রীমঙ্গল নিলাম বুধবার এবং পঞ্চগড় নিলাম অনুষ্ঠিত হয় মঙ্গলবার (প্রতি মাসে দুবার)।

বাংলাদেশ স্মল টি গার্ডেন ওনার্স অ্যান্ড টি ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এবিএম আখতারুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশের সবচেয়ে দ্রুত উৎপাদন বৃদ্ধির জেলা হিসেবে পঞ্চগড় চা খাতে বিশেষ অবদান রাখছে। দেড়-দুই দশকে এখানকার চা শিল্প আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশকে স্বয়ংসম্পূর্ণ অবস্থায় নিয়ে গেছে। পঞ্চগড় জেলা হিসেবে মৌলভীবাজারের পর সবচেয়ে বেশি চা উৎপাদন করে। নিলাম কেন্দ্র চালু হলেও এখনো ক্রেতাদের আকৃষ্ট করা সম্ভব হয়নি।’ তবে সরকারের নীতিসহায়তার পাশাপাশি অনলাইনভিত্তিক নিলাম বাজারকে জনপ্রিয় করা গেলে পঞ্চগড় চা নিলাম কেন্দ্র ভবিষ্যতে দেশের আকর্ষণীয় নিলাম কেন্দ্রে পরিণত হবে বলে আশা করছেন তিনি।

আরও